![]() |
| অসুখী একজন |
📘 লাইন ধরে ব্যাখ্যা
কবিতা: ‘অসুখী একজন’ – পাবলো নেরুদা
১️⃣ “আমি তাকে ছেড়ে দিলাম… আমি চলে গেলাম দূর… দূরে।”
কবি প্রিয় নারীকে দরজায় অপেক্ষায় রেখে চলে যান। এটি বিচ্ছেদ ও নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তের প্রকাশ।
২️⃣ “সে জানত না আমি আর কখনো ফিরে আসব না।”
মেয়েটি আশায় ছিল, কিন্তু কবি জানতেন—এই বিচ্ছেদ চিরস্থায়ী।
৩️⃣ “একটা কুকুর চলে গেল… একটা বছর কেটে গেল।”
দৈনন্দিন জীবনের চলমানতা বোঝানো হয়েছে—সময় থেমে থাকে না।
৪️⃣ “বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল আমার পায়ের দাগ / ঘাস জন্মালো রাস্তায়”
প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে সব চিহ্ন মুছে দেয়—কবির অস্তিত্বও।
৫️⃣ “পাথরের মতো বছরগুলো / নেমে এল তার মাথার ওপর”
দীর্ঘ অপেক্ষা মেয়েটির জীবনে ভার হয়ে নেমে আসে।
৬️⃣ “তারপর যুদ্ধ এল / রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো”
যুদ্ধের ভয়াবহতা ও রক্তক্ষয়ী রূপ তুলে ধরা হয়েছে।
৭️⃣ “শিশু আর বাড়িরা খুন হলো”
যুদ্ধ নিরপরাধ মানুষ ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করে—মানবতার মৃত্যু ঘটে।
৮️⃣ “সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না”
সব ধ্বংস হলেও মেয়েটি বেঁচে থাকে—অপেক্ষার প্রতীক হিসেবে।
৯️⃣ “দেবতারা… উল্টে পড়ল মন্দির থেকে”
যুদ্ধ ধর্ম, বিশ্বাস ও সভ্যতাকেও ধ্বংস করে দেয়।
🔟 “যেখানে ছিল শহর… রক্তের একটা কালো দাগ”
সভ্য শহর পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
🔚 “আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়”
সবশেষে শুধু অপেক্ষাই বেঁচে থাকে—এটাই কবিতার মূল বেদনা।
ভাবার্থ
কবিতাটিতে একজন পুরুষ তার প্রিয় নারীকে দরজায় অপেক্ষায় রেখে চিরতরে চলে যাওয়ার কথা বলছে। সময় এগিয়ে যায়—দিন, বছর, যুগ—প্রকৃতি তার পায়ের ছাপ মুছে দেয়, কিন্তু মেয়েটির অপেক্ষা শেষ হয় না। এরপর আসে যুদ্ধ—ভয়াবহ, রক্তক্ষয়ী, ধ্বংসাত্মক। শহর, ঘর, মন্দির, দেবতা—সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। তবু সেই মেয়েটি বেঁচে থাকে, অপেক্ষায় থাকে।
মূল বিষয় ও প্রতীক
-
অপেক্ষা: মেয়েটির অবিরাম অপেক্ষা মানবিক ভালোবাসা ও আশার প্রতীক।
-
সময়: “পাথরের মতো বছর” সময়ের নিষ্ঠুর ভার বোঝায়।
-
যুদ্ধ: শুধু মানুষের নয়, সভ্যতা, স্মৃতি ও স্বপ্নের ধ্বংস।
-
প্রকৃতি ও দেবতা: ধ্যানমগ্ন দেবতাদের পতন দেখায়—যুদ্ধ সব পবিত্রতাকেও ভেঙে দেয়।
-
অসুখী মানুষ: কবির অপরাধবোধ—সে ফিরে আসেনি, কিন্তু মেয়েটি অপেক্ষা করে গেছে।
সারকথা
এটি প্রেম-বিচ্ছেদ, সময়ের নিষ্ঠুরতা ও যুদ্ধের সর্বগ্রাসী ধ্বংসের কবিতা। সবকিছু পুড়ে ছাই হলেও মানুষের অপেক্ষা ও স্মৃতি টিকে থাকে—এটাই কবিতার সবচেয়ে বেদনাময় সত্য।
পাবলো নেরুদার মূল কবিতা 'La Desdichada'-এর নবারুণ ভট্টাচার্য কৃত এই অনুবাদটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মর্মস্পর্শী। 'অসুখী একজন' কবিতাটি মূলত যুদ্ধ, ধ্বংস এবং অপেক্ষার এক মহাকাব্যিক আখ্যান।
এখানে কবিতাটির মূল ভাব ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করা হলো:
১. চিরন্তন অপেক্ষা
কবিতাটি শুরু হয় এক বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে। কথক তার প্রিয়তমাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে দূরে চলে যান। সময়ের প্রবাহ বোঝাতে কবি কুকুর, গির্জার নান এবং ঘাস জন্মানোর অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন। বছরের পর বছর কেটে গেলেও মেয়েটির অপেক্ষা ফুরায় না; সেই প্রতীক্ষা তার কাছে পাথরের মতো ভারী হয়ে ওঠে।
২. যুদ্ধের ধ্বংসলীলা
শান্ত ও স্থির জীবনের ওপর নেমে আসে যুদ্ধের বিভীষিকা। কবি যুদ্ধকে তুলনা করেছেন 'রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের' সাথে। এই যুদ্ধে কোনো ভেদাভেদ নেই—শিশু এবং ঘরবাড়ি সমানভাবে ধ্বংস হয়। এমনকি দীর্ঘকাল ধ্যানে মগ্ন 'শান্ত হলুদ দেবতারা'ও রক্ষা পান না। তাদের মন্দির ভেঙে পড়ে এবং তারা তাদের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এটি মূলত প্রচলিত ধর্ম বা বিশ্বাসের অসহায়ত্বকেই ফুটিয়ে তোলে।
৩. স্মৃতি ও ধ্বংসের বৈপরীত্য
কবি তার ফেলে আসা প্রিয় মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করেছেন:
ঝুলন্ত বিছানা
গোলাপি গাছ
প্রাচীন জলতরঙ্গ (এক ধরণের বাদ্যযন্ত্র)
করতলের মতো পাতা
এসবই যুদ্ধের আগুনে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। যুদ্ধের পর শহরের চেহারা পাল্টে গিয়ে সেখানে কেবল পড়ে থাকে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর বীভৎস পাথরের মাথা।
৪. ভালোবাসার অমরত্ব
কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো—যুদ্ধ সবকিছু ধ্বংস করতে পারলেও সেই অপেক্ষারত মেয়েটিকে মারতে পারে না। "সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়"—এই শেষ লাইনটি প্রমাণ করে যে ধ্বংসের স্তূপের মাঝেও মানবিক ভালোবাসা এবং প্রতীক্ষা অমর। মৃত্যু এবং ধ্বংসের ঊর্ধ্বে এক শাশ্বত সত্য হিসেবে মেয়েটি টিকে থাকে।
পাবলো নেরুদার এই কবিতাটি কেবল বিরহের নয়, এটি যুদ্ধের এক ভয়াবহ দালিলিক প্রমাণ। এর প্রেক্ষাপট এর পেছনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং কিছু বিশেষ প্রতীকের গভীর অর্থ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ (Spanish Civil War)
নেরুদা যখন স্পেনে চিলির কনসাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন সেখানে গৃহযুদ্ধ (১৯৩৬-১৯৩৯) শুরু হয়। এই যুদ্ধে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং প্রখ্যাত কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা আততায়ীর হাতে নিহত হন। এই ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং যুদ্ধের নৃশংসতা নেরুদাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
রক্তের আগ্নেয়পাহাড়: কবিতায় যুদ্ধের এই উপমাটি সরাসরি স্পেনের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে নির্দেশ করে।
শান্ত হলুদ দেবতারা: হাজার বছর ধরে ধ্যানে মগ্ন দেবতাদের উল্টে পড়া মূলত ইউরোপের দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের ভেঙে পড়াকে বোঝায়। যুদ্ধের সামনে কোনো অলৌকিক শক্তিই মানুষকে রক্ষা করতে পারেনি।
২. গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকের ব্যাখ্যা
| প্রতীক | তাৎপর্য |
| পাথরের মতো বছর | সময় যখন খুব যন্ত্রণাদায়ক হয়, তখন তা স্থির ও ভারী মনে হয়। এখানে প্রতীক্ষার অসহ্য ভার বোঝাতে 'পাথর' ব্যবহার করা হয়েছে। |
| পায়ের দাগ ধুয়ে যাওয়া | এটি অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার প্রতীক। কথক আর কখনোই ফিরবেন না—প্রকৃতি যেন তার সেই ফেরার পথকেও মুছে ফেলেছে। |
| জলতরঙ্গ ও গোলাপি গাছ | এগুলো যুদ্ধের আগের সুন্দর, ছন্দময় ও নান্দনিক জীবনের প্রতীক। যা পরবর্তীতে কাঠকয়লা আর দোমড়ানো লোহায় পরিণত হয়। |
| রক্তের কালো দাগ | তাজা রক্ত শুকিয়ে গেলে কালো হয়ে যায়। এটি যুদ্ধের নৃশংসতা শেষ হওয়ার অনেক পরেও তার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের চিহ্ন বহন করে। |
৩. মেয়েটি কেন মরল না?
কবিতায় শিশু মারা গেল, দেবতারা চূর্ণ হলেন, কিন্তু "সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না।" এর দুটি সম্ভাব্য গভীর অর্থ আছে:
আদর্শগত দিক: মেয়েটি এখানে কেবল একজন মানুষ নন, বরং তিনি 'অপেক্ষারত ভালোবাসা' বা 'মাতৃভূমি'-র প্রতীক। অত্যাচারী বা যুদ্ধ ঘরবাড়ি ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের আশা এবং ভালোবাসাকে হত্যা করতে পারে না।
বিমূর্ত রূপ: ধ্বংসের স্তূপের মাঝেও মানবিক আবেগ যে অবিনশ্বর, মেয়েটি সেই সত্যেরই প্রতিনিধি।
পাবলো নেরুদার কবিতার মূল সুরকে অক্ষুণ্ণ রেখে নবারুণ ভট্টাচার্য যেভাবে এটিকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন, তা এক কথায় অনন্য। নিচে নবারুণের অনুবাদ শৈলী এবং কবিতার কিছু বিশেষ শৈল্পিক দিক আলোচনা করা হলো:
১. নবারুণ ভট্টাচার্যের অনুবাদ শৈলী: রুক্ষ ও শক্তিশালী
নবারুণ ভট্টাচার্য নিজে ছিলেন একজন দ্রোহের কবি। নেরুদার কবিতার রাজনৈতিক ও মানবিক যন্ত্রণাগুলো তিনি খুব কাছ থেকে অনুভব করেছিলেন।
২. কবিতার শিল্পকলা ও আঙ্গিক (Artistic Aspects)
কবিতাটি পড়ার সময় আমরা কয়েকটি স্তরে এর বিবর্তন লক্ষ্য করি:
রঙের ব্যবহার (Imagery of Colors):
হলুদ: শান্ত হলুদ দেবতারা (প্রাচীনত্ব ও জরাজীর্ণতার প্রতীক)।৩. বৈপরীত্যের অলঙ্কার (Contrast)
কবিতাটিতে কবি চমৎকার কিছু বৈপরীত্য ব্যবহার করেছেন যা এর শৈল্পিক মান বাড়িয়ে দিয়েছে:
আপনার কৌতূহল মেটাতে:
নেরুদা এই কবিতাটি যখন লেখেন, তখন তিনি 'এস্পানিয়া এন এল কোরাজন' (España en el corazón) বা 'হৃদয়ে স্পেন' নামক কাব্যগ্রন্থের পরিকল্পনা করছিলেন। এই কবিতাটির মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, যুদ্ধ কেবল ঘরবাড়ি ভাঙে না, তা মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত স্বপ্নকেও চূর্ণ করে দেয়।
