![]() |
| জ্ঞানচক্ষু | আশাপূর্ণা দেবী |
Ghanchakshu Question and Answer
জ্ঞানচক্ষু
আশাপূর্ণা দেবী
কথাটা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল!
নতুন মেসোমশাই, মানে যাঁর সঙ্গে এই কদিন আগে তপনের ছোটোমাসির বিয়ে হয়ে গেল দেদার ঘটাপটা করে, সেই তিনি নাকি বই লেখেন। সে সব বই নাকি ছাপাও হয়। অনেক বই ছাপা হয়েছে মেসোর।
তার মানে-তপনের নতুন মেসোমশাই একজন লেখক। সত্যিকার লেখক।
জলজ্যান্ত একজন লেখককে এত কাছ থেকে কখনো দেখেনি তপন, দেখা যায়, তাই জানতো না। লেখকরা যে তপনের বাবা, ছোটোমামা বা মেজোকাকুর মতো মানুষ, এবিষয়ে সন্দেহ ছিল তপনের।
কিন্তু নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের।
আশ্চর্য, কোথাও কিছু উলটোপালটা নেই, অন্য রকম নেই, একেবারে নিছক মানুষ। সেই ওঁদের মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, খেতে বসেই 'আরে ব্যস, এত কখনো খাওয়া যায়?' বলে অর্ধেক তুলিয়ে দেন, চানের সময় চান করেন এবং ঘুমের সময় ঘুমোন।
তাছাড়া- ঠিক ছোটো মামাদের মতোই খবরের কাগজের সব কথা নিয়ে প্রবলভাবে গল্প করেন, তর্ক করেন, আর শেষ পর্যন্ত 'এ দেশের কিছু হবে না' বলে সিনেমা দেখতে চলে যান, কী বেড়াতে বেরোন সেজেগুজে।
মামার বাড়িতে এই বিয়ে উপলক্ষ্যেই এসেছে তপন, আর ছুটি আছে বলেই রয়ে গেছে। ওদিকে মেসোরও না কী গরমের ছুটি চলছে। তাই মেসো শ্বশুরবাড়িতে এসে রয়েছেন কদিন।
তাই অহরহই জলজ্যান্ত একজন লেখককে দেখবার সুযোগ হবেই তপনের। আর সেই সুযোগেই দেখতে পাচ্ছে তপন, 'লেখক' মানে কোনো আকাশ থেকে পড়া জীব নয়, তপনদের মতোই মানুষ।
তবে তপনেরই বা লেখক হতে বাধা কী?
মেসোমশাই কলেজের প্রফেসার, এখন ছুটি চলছে তাই সেই সুযোগে শ্বশুরবাড়িতেই রয়ে গেছেন কদিন। আর সেই সুযোগেই দিব্যি একখানি দিবানিদ্রা দিচ্ছিলেন। ছোটোমাসি সেই দিকে ধাবিত হয়।
তপন অবশ্য 'না আ-আ-' করে প্রবল আপত্তি তোলে, কিন্তু কে শোনে তার কথা?
ততক্ষণে তো গল্প ছোটোমেসোর হাতে চলেই গেছে। হইচই করে দিয়ে দিয়েছে ছোটোমাসি তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে।
তপন অবশ্য মাসির এই হইচইতে মনে মনে পুলকিত হয়।
মুখে আঁ আঁ করলেও হয়।
কারণ লেখার প্রকৃত মূল্য বুঝলে নতুন মেসোই বুঝবে। রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই।
একটু পরেই ছোটোমেসো ডেকে পাঠান তপনকে এবং বোধকরি নতুন বিয়ের শ্বশুরবাড়ির ছেলেকে খুশি করতেই বলে ওঠেন, 'তপন, তোমার গল্প তো দিব্যি হয়েছে। একটু 'কারেকশান' করে ইয়ে করে দিলে ছাপতে দেওয়া চলে।'
তপন প্রথমটা ভাবে ঠাট্টা, কিন্তু যখন দেখে মেসোর মুখে করুণার ছাপ, তখন আহ্লাদে কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়।
'তা হলে বাপু তুমি ওর গল্পটা ছাপিয়ে দিও-মাসি বলে, 'মেসোর উপযুক্ত কাজ হবে সেটা।'
মেসো তেমনি করুণার মূর্তিতে বলেন, 'তা দেওয়া যায়। আমি বললে 'সন্ধ্যাতারার' সম্পাদক 'না' করতে পারবে না। ঠিক আছে; তপন, তোমার গল্প আমি ছাপিয়ে দেবো।'
বিকেলে চায়ের টেবিলে ওঠে কথাটা। আর সবাই তপনের গল্প শুনে হাসে। কিন্তু মেসো বলেন, 'না-না আমি বলছি-তপনের হাত আছে। চোখও আছে। নচেৎ এই বয়সের ছেলেমেয়েরা গল্প লিখতে গেলেই তো-হয় রাজারানির গল্প লেখে, নয় তো-খুন জখম অ্যাকসিডেন্ট, অথবা না খেতে পেয়ে মরে যাওয়া, এইসব মালমশলা নিয়ে বসে। তপন যে সেই দিকে যায়নি, শুধু ওর ভরতি হওয়ার দিনের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির বিষয় নিয়ে লিখেছে, এটা খুব ভালো। ওর হবে।'
তপন বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর ছুটি ফুরোলে মেসো গল্পটি নিয়ে চলে গেলেন। তপন কৃতার্থ হয়ে বসে বসে দিন গোনে।
এই কথাটাই ভাবছে তপন রাত-দিন। ছেলেবেলা থেকেই তো রাশি রাশি গল্প শুনেছে তপন আর এখন বস্তা বস্তা পড়ছে, কাজেই গল্প জিনিসটা যে কী সেটা জানতে তো বাকি নেই?
শুধু এইটাই জানা ছিল না, সেটা এমনই সহজ মানুষেই লিখতে পারে। নতুন মেসোকে দেখে জানল সেটা। তবে আর পায় কে তপনকে?
দুপুরবেলা, সবাই যখন নিথর নিথর, তখন তপন আস্তে একটি খাতা (হোম টাস্কের খাতা আর কী। বিয়ে বাড়িতেও যেটি মা না আনিয়ে ছাড়েননি।) আর কলমটি নিয়ে তিনতলার সিঁড়িতে উঠে গেল, আর তোমরা বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, একাসনে বসে লিখেও ফেলল আস্ত একটা গল্প।
লেখার পর যখন পড়ল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তপনের, মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল।
একী ব্যাপার! এ যে সত্যিই হুবহু গল্পের মতোই লাগছে! তার মানে সত্যিই একটা গল্প লিখে ফেলেছে তপন। তার মানে তপনকে এখন 'লেখক' বলা চলে।
হঠাৎ ভয়ানক একটা উত্তেজনা অনুভব করে তপন, আর দুদ্দাড়িয়ে নীচে নেমে এসে-ছোটোমাসিকেই বলে বসে, 'ছোটোমাসি, একটা গল্প লিখেছি।'
ছোটোমাসিই ওর চিরকালের বন্ধু, বয়সে বছর আষ্টেকের বড়ো হলেও সমবয়সি, কাজেই মামার বাড়ি এলে সব কিছুই ছোটোমাসির কাছে। তাই এই ভয়ানক আনন্দের খবরটা ছোটোমাসিকে সর্বাগ্রে দিয়ে বসে।
তবে বিয়ে হয়ে ছোটোমাসি যেন একটু মুরুব্বি মুরুব্বি হয়ে গেছে, তাই গল্পটা সবটা না পড়েই একটু চোখ বুলিয়েই বেশ পিঠ চাপড়ানো সুরে বলে, 'ওমা এ তো বেশ লিখেছিস রে? কোনোখান থেকে টুকলিফাই করিসনি তো?
'আঃ ছোটোমাসি, ভালো হবে না বলছি।'
'আরে বাবা খেপছিস কেন? জিজ্ঞেস করছি বই তো নয়! রোস তোর মেসোমশাইকে দেখাই-।'
কিন্তু গেলেন তো-গেলেনই যে।
কোথায় গল্পের সেই আঁটসাঁট ছাপার অক্ষরে গাঁথা চেহারাটি? যার জন্যে হাঁ করে আছে তপন? মামার বাড়ি থেকে বাড়িতে চলে এসেও।
এদিকে বাড়িতে তপনের নাম হয়ে গেছে, কবি, সাহিত্যিক, কথাশিল্পী। আর উঠতে বসতে ঠাট্টা করছে 'তোর হবে। হাঁ বাবা তোর হবে।'
তবু এইসব ঠাট্টা-তামাশার মধ্যেই তপন আরো দু'তিনটে গল্প লিখে ফেলেছে। ছুটি ফুরিয়ে এসেছে, হোম টাস্ক হয়ে ওঠেনি, তবু লিখছে। লুকিয়ে লিখছে। যেন নেশায় পেয়েছে।
তারপর ছুটি ফুরোল, রীতিমতো পড়া শুরু হয়েছে। প্রথম গল্পটি সম্পর্কে একেবারে আশা ছাড়া হয়ে গেছে, বিষণ্ণ মন নিয়ে বসে আছে এমন সময় ঘটল সেই ঘটনা।
ছোটোমাসি আর মেসো একদিন বেড়াতে এল, হাতে এক সংখ্যা 'সন্ধ্যাতারা'।
কেন? হেতু? 'সন্ধ্যাতারা' নিয়ে কেন?
বুকের রক্ত ছলকে ওঠে তপনের।
তবে কী? সত্যিই তাই? সত্যিই তপনের জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনটি এল আজ?
কিন্তু তাই কী সম্ভব? সত্যিকার ছাপার অক্ষরে তপন কুমার রায়ের লেখা গল্প, হাজার-হাজার ছেলের হাতে হাতে ঘুরবে?
পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে?
তা ঘটেছে, সত্যিই ঘটেছে।
সূচিপত্রেও নাম রয়েছে।
'প্রথম দিন' (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়।
সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়, তপনের লেখা গল্প পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ওর লেখক মেসো ছাপিয়ে দিয়েছে। পত্রিকাটি সকলের হাতে হাতে ঘোরে, সকলেই একবার করে চোখ বোলায় আর বলে, 'বারে, চমৎকার লিখেছে তো।'
মেসো অবশ্য মৃদু মৃদু হাসেন, বলেন, 'একট-আধটু 'কারেকশান' করতে হয়েছে অবশ্য। নেহাত কাঁচা তো?'
মাসি বলে, 'তা হোক, নতুন নতুন অমন হয়-'
ক্রমশ ও কথাটাও ছড়িয়ে পড়ে।
ওই কারেকশানের কথা।
বাবা বলেন, 'তাই। তা নইলে ফট করে একটা লিখল, আর ছাপা হলো,-'
মেজোকাকু বলেন, 'তা ওরকম একটি লেখক মেসো থাকা মন্দ নয়। আমাদের থাকলে আমরাও চেষ্টা করে দেখতাম।'
ছোটোমাসি আত্মপ্রসাদের প্রসন্নতা নিয়ে বসে বসে ডিম ভাজা আর চা খায়, মেসো শুধু কফি।
আজ আর অন্য কথা নেই, শুধু তপনের গল্পের কথা, আর তপনের নতুন মেসোর মহত্ত্বের কথা। উনি নিজে গিয়ে না দিলে কি আর 'সন্ধ্যাতারা'-র সম্পাদক তপনের গল্প কড়ে আঙুল দিয়ে ছুঁতো?
তপন যেন কোথায় হারিয়ে যায় এইসব কথার মধ্যে। গল্প ছাপা হলে যে ভয়ংকর আহ্লাদটা হবার কথা, সে আহ্লাদ খুঁজে পায় না।
অনেকক্ষণ পরে মা বলেন, 'কই তুই নিজের মুখে একবার পড় তো তপন শুনি! বাবা, তোর পেটে পেটে এত!'
এতক্ষণে বইটা নিজের হাতে পায় তপন।
মা বলেন, 'কই পড়? লজ্জা কী? পড়, সবাই শুনি।'
তপন লজ্জা ভেঙে পড়তে যায়।
কেশে গলা পরিষ্কার করে।
কিন্তু এ কী!
এসব কী পড়ছে তপন?
এ কার লেখা?
এর প্রত্যেকটি লাইন তো নতুন আনকোরা, তপনের অপরিচিত।
এর মধ্যে তপন কোথা?
তার মানে মেসো তপনের গল্পটিকে আগাগোড়াই কারেকশান করেছেন। অর্থাৎ নতুন করে লিখেছেন, নিজের পাকা হাতে কলমে। তপন আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে। তারপর ধমক খায়, 'কীরে তোর যে দেখি পায়া ভারী হয়ে গেল। সবাই শুনতে চাইছে তবু পড়ছিস না? না কি অতি আহ্লাদে বাক্য হরে গেল?'
তপন গড়গড়িয়ে পড়ে যায়। তপনের মাথায় ঢোকে না-সে কী পড়ছে। তবু 'ধন্যি ধন্যি' পড়ে যায়। আর একবার রব ওঠে তপনের লেখক মেসো তপনের গল্পটি ছাপিয়ে দিয়েছে।
তপন বইটা ফেলে রেখে চলে যায়, তপন ছাতে উঠে গিয়ে শার্টের তলাটা তুলে চোখ মোছে। তপনের মনে হয় আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন। কেন? তা জানে না তপন।
শুধু এই দুঃখের মুহূর্তে গভীরভাবে সংকল্প করে তপন, যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয় তো, তপন নিজে
গিয়ে দেবে। নিজের কাঁচা লেখা। ছাপা হয় হোক, না হয় না হোক।
তপনকে যেন আর কখনো শুনতে না হয় 'অমুক তপনের লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে।'
আর তপনকে যেন নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়তে না হয়।
তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের।
গল্পের মূল সারসংক্ষেপ:
তপন নামক এক কিশোরের ধারণা ছিল লেখকরা বুঝি ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো অলৌকিক জীব। কিন্তু তার নতুন মেসোমশাইকে (যিনি একজন লেখক ও অধ্যাপক) দেখে তার সেই ভুল ভাঙে। সে বুঝতে পারে লেখকরাও সাধারণ মানুষের মতো দাড়ি কামান, সিগারেট খান বা খাবার নিয়ে বায়না করেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তপনের প্রথম ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মীলিত হয়—সে বুঝতে পারে সে নিজেও লিখতে পারে।
তপন তার স্কুলের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি গল্প লেখে। মেসোমশাই গল্পটির প্রশংসা করেন এবং সেটি ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে তিনি জানান যে গল্পটি একটু ‘কারেকশান’ করতে হবে।
চরম আঘাত ও শিক্ষা:
গল্পটি যখন ছাপা হয়ে আসে, তখন বাড়িতে উৎসবের মেজাজ তৈরি হয়। কিন্তু তপন যখন নিজের গল্পটি পড়তে যায়, সে অবাক হয়ে দেখে মেসোমশাই ‘কারেকশান’-এর নামে গল্পের প্রতিটি লাইন বদলে নিজের ভাষায় লিখে দিয়েছেন। সেখানে তপনের নিজস্ব কোনো মৌলিকতা আর অবশিষ্ট নেই। প্রশংসার বদলে সবাই মেসোমশাইয়ের ‘মহত্ত্ব’ নিয়েই বেশি আলোচনা করতে থাকে।
তপন উপলব্ধি করে যে, অন্যের দয়ায় নিজের নাম ছাপিয়ে নেওয়ার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই, বরং তা চরম অপমানের। এখানেই তার দ্বিতীয়বার ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মীলিত হয়। সে প্রতিজ্ঞা করে, ভবিষ্যতে গল্প লিখলে সে নিজেই সেটি জমা দিয়ে আসবে, তা ছাপা হোক বা না হোক—তাতে অন্তত তার নিজের সত্তা থাকবে।
গল্পের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক:
| বিষয় | তাৎপর্য |
| নামকরণ | ‘জ্ঞানচক্ষু’ অর্থ অন্তর্দৃষ্টি। তপনের ভুল ধারণা ভাঙা এবং নিজের আত্মসম্মান বোধ জাগ্রত হওয়াকেই এখানে রূপকভাবে বোঝানো হয়েছে। |
| রন্ধন ও জহুরি | মেসোমশাইকে এখানে ‘জহুরি’ বলা হয়েছে কারণ তিনি রত্ন (তপনের প্রতিভা) চিনতে পেরেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি তার প্রতিভার মর্যাদা দেননি। |
| তপনের সংকল্প | গল্পের শেষে তপনের সংকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাকে পরনির্ভরশীলতা থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষা দেয়। |
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (প্রতিটির মান - ১)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (প্রতিটির মান - ২/৩)
১. তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গিয়েছিল কেন? উত্তর: নিজের নতুন মেসোমশাই একজন ‘সত্যিকারের লেখক’ এবং তাঁর অনেক বই ছাপা হয়েছে শুনে বিস্ময়ে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গিয়েছিল।
২. মেসোমশাই কোন পত্রিকার সম্পাদককে চিনতেন? উত্তর: মেসোমশাই ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকার সম্পাদককে চিনতেন।
৩. তপনের লেখা গল্পের নাম কী ছিল? উত্তর: তপনের লেখা গল্পের নাম ছিল ‘প্রথম দিন’।
৪. ‘তপনের হাত আছে’—এখানে ‘হাত থাকা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? উত্তর: এখানে ‘হাত থাকা’ বলতে তপনের সহজাত লিখনশৈলী বা লেখার দক্ষতা ও প্রতিভাকে বোঝানো হয়েছে।
৫. বিকেলে চায়ের টেবিলে কোন কথা ওঠে? উত্তর: মেসোমশাই তপনের গল্পটি ছাপিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই কথাটিই বিকেলে চায়ের টেবিলে ওঠে।
৬. সূচিপত্রে তপনের নাম কী ভাবে লেখা ছিল? উত্তর: সূচিপত্রে লেখা ছিল— ‘প্রথম দিন’ (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়।
৭. “রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই”—উক্তিটির তাৎপর্য লেখো। উত্তর: রত্ন যেমন সাধারণ মানুষ চিনতে পারে না, কেবল জহুরি চেনে, তেমনি তপনের লেখা গল্পের প্রকৃত গুণাগুণ একজন লেখক হিসেবে নতুন মেসোই বুঝবেন—তপনের এই বিশ্বাসের কথা এখানে বলা হয়েছে।
৮. “তপন যেন কোথায় হারিয়ে যায় এইসব কথার মধ্যে”—কোন কথার কথা বলা হয়েছে? উত্তর: তপনের গল্প ছাপা হওয়ার পর বাড়িতে যে শোরগোল পড়েছিল, সেখানে সবাই তপনের কৃতিত্বের চেয়ে মেসোমশাইয়ের ‘মহত্ত্ব’ ও তাঁর ‘কারেকশন’ করার বিষয় নিয়ে বেশি আলোচনা করছিল। এই পরনির্ভরশীল আলোচনার ভিড়ে তপনের নিজস্ব আনন্দ হারিয়ে গিয়েছিল।
৯. “আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন”—তপনের কেন এমন মনে হয়েছিল? উত্তর: নিজের লেখা গল্প পত্রিকায় ছাপা হওয়া আনন্দের বিষয় হলেও, তপন যখন সেটি পড়তে যায়, দেখে মেসোমশাই পুরো গল্পটিই বদলে নিজের ভাষায় লিখে দিয়েছেন। নিজের নামে অন্যের লেখা পড়ার এই অপমানই তপনের কাছে দিনটিকে দুঃখের করে তুলেছিল।
১০. তপনের ‘জ্ঞানচক্ষু’ কীভাবে খুলেছিল? উত্তর: প্রথমে মেসোকে দেখে তপন বুঝেছিল লেখকরা ভিনগ্রহের জীব নন, তারা সাধারণ মানুষ। কিন্তু গল্পের শেষে সে বুঝতে পারে, নিজের কাঁচা লেখা ছাপা হওয়া সম্মানের, অন্যের দয়ায় বা অন্যের ভাষায় নিজের নাম ছাপানো অপমানের। এই আত্মোপলব্ধির মাধ্যমেই তপনের প্রকৃত জ্ঞানচক্ষু খুলেছিল।
১. "তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল" — কখন এবং কীভাবে তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলেছিল?
উত্তর: তপনের ধারণা ছিল লেখকরা বুঝি সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা কোনো জগতের প্রাণী। কিন্তু তার লেখক মেসোমশাইকে খুব কাছ থেকে দেখে তপন বুঝল যে, লেখকরাও সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করেন—দাড়ি কামান, খাবার খেতে গিয়ে আপত্তি করেন বা খবরের কাগজ পড়ে তর্ক করেন। এই সাধারণ সত্যটি উপলব্ধি করেই তপনের প্রথমবার 'জ্ঞানচক্ষু' খুলেছিল।
২. "রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই" — কথাটির তাৎপর্য কী?
উত্তর: এখানে 'রত্ন' বলতে তপনের লেখা গল্প এবং 'জহুরি' বলতে লেখক মেসোমশাইকে বোঝানো হয়েছে। একজন জহুরি যেমন হীরে বা রত্ন চিনতে ভুল করেন না, তেমনি একজন অভিজ্ঞ লেখক হিসেবে মেসোই পারবেন তপনের কাঁচা হাতের লেখার আসল গুণমান বুঝতে—তপনের এই বিশ্বাসের কথাই এখানে বলা হয়েছে।
৩. "পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে?" — অলৌকিক ঘটনাটি কী ছিল?
উত্তর: তপনের লেখা গল্প 'প্রথম দিন', তার নিজের নামে 'সন্ধ্যাতারা'র মতো একটি নামী পত্রিকায় ছাপা হয়ে হাজার হাজার পাঠকের হাতে পৌঁছাবে—এই অভাবনীয় বিষয়টিকেই তপনের কাছে 'অলৌকিক' মনে হয়েছে।
৪. "তপন আর পড়তে পারে না, বোবার মতো বসে থাকে" — তপনের এমন অবস্থার কারণ কী?
উত্তর: তপন যখন সাগ্রহে নিজের ছাপা হওয়া গল্পটি পড়তে শুরু করে, সে দেখে মেসোমশাই সংশোধনের (কারেকশন) নামে গল্পের প্রতিটি লাইন বদলে দিয়েছেন। সেখানে তপনের মৌলিকতা বা নিজস্ব কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট নেই। নিজের গল্পের বদলে অন্যের লেখা পড়তে হওয়ার অপমানে ও যন্ত্রণায় তপন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
৫. গল্পের শেষে তপনের সংকল্পটি কী ছিল?
উত্তর: তপন সংকল্প করেছিল যে, যদি কখনো সে লেখা ছাপতে দেয়, তবে সে নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে। তাতে লেখা ছাপা হোক বা না হোক, অন্তত তাকে যেন অন্যের লেখা গল্প নিজের নামে পড়তে না হয় এবং 'অমুক আমার লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে'—এই করুণা যেন শুনতে না হয়।
বড় প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)
১. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প অবলম্বনে তপন চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
ভূমিকা: আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিশোর তপন। তার মানসিক জগতের বিবর্তন এবং আত্মমর্যাদাবোধের জাগরণই এই গল্পের মূল ভিত্তি।
কল্পনাপ্রবণতা: গল্পের শুরুতে তপন অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ। লেখকদের সে সাধারণ মানুষ বলে ভাবতেই পারত না। মেসোকে দেখে তার সেই ভুল ভাঙে এবং সে অনুপ্রাণিত হয়ে গল্প লিখে ফেলে।
সরলতা ও আত্মবিশ্বাস: তপন অত্যন্ত সরল। সে বিশ্বাস করেছিল যে মেসোমশাই তার গল্পটি সামান্য ‘কারেকশন’ করে ছাপিয়ে দেবেন। সে নিজের প্রতিভায় বিশ্বাস রেখে একাসনে বসে আস্ত একটি গল্প লিখে ফেলেছিল।
সংবেদনশীলতা: নিজের লেখা গল্প অন্যের নামে (মেসোর ভাষায়) পড়ার সময় তপন গভীর মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়। সে কেবল একজন নাম-সর্বস্ব লেখক হতে চায়নি, বরং নিজের সত্তাকেই খুঁজে পেতে চেয়েছিল।
আত্মসম্মান ও সংকল্প: গল্পের শেষে তপন এক দৃঢ়চেতা চরিত্রে পরিণত হয়। অন্যের করুণায় নাম ছাপানোর চেয়ে নিজের কাঁচা লেখা নিয়ে পড়ে থাকা অনেক বেশি সম্মানের—এই উপলব্ধির মাধ্যমে তার চরিত্রটি পূর্ণতা পায়।
২. “তপনের আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে।”—তপনের এই মানসিক অবস্থার কারণ কী? শেষ পর্যন্ত তপন কী শিক্ষা লাভ করেছিল? (২+৩)
মানসিক অবস্থার কারণ:
তপন অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে নিজের ছাপা হওয়া গল্পটি পড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু পড়তে গিয়ে সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। সে দেখে, মেসোমশাই ‘কারেকশন’-এর নামে গল্পের প্রতিটি লাইন নিজের পাকা হাতের কলমে লিখে দিয়েছেন। সেখানে তপনের নিজস্ব ভাষা বা অনুভূতির লেশমাত্র নেই। নিজের নামে অন্যের লেখা পড়ার এই চরম অপমান এবং প্রতারণা তপনকে বাকরুদ্ধ বা ‘বোবার মতো’ করে দিয়েছিল।
তপনের শিক্ষা:
এই তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তপনের প্রকৃত ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মীলিত হয়। সে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পায়:
প্রথমত, সৃজনশীল কাজে অন্যের করুণা বা সাহায্য নেওয়া মানে নিজের সত্তাকে বিসর্জন দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, যদি কখনো লেখা ছাপতে দিতে হয়, তবে সে নিজের হাতেই দেবে। সেটি ‘কাঁচা লেখা’ হলেও তাতে নিজের মৌলিকত্ব থাকবে। অন্যের সাহায্য নিয়ে ‘লেখক’ সাজার চেয়ে নিজের ব্যর্থতাও অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত টীকা বা ব্যাখ্যা:
| উদ্ধৃতি | মূল ভাব |
| "মেসোমশাইয়ের মহত্ত্ব" | বাড়ির লোক তপনের কৃতিত্বকে গুরুত্ব না দিয়ে মেসোমশাই যে অনুগ্রহ করে গল্পটি ছাপিয়েছেন, তাকেই বড় করে দেখেছে। |
| "তপন ছাতে উঠে গিয়ে চোখ মোছে" | এটি তপনের নিঃশব্দ প্রতিবাদ এবং গভীর দুঃখের বহিঃপ্রকাশ। সাফল্যের দিনেও সে ছিল নিঃসঙ্গ। |
| "নিজের কাঁচা লেখা" | এটি তপনের শিল্পীসত্তার সততার প্রতীক। সে ধার করা আলোয় আলোকিত হতে চায়নি। |
